Tista Tv
     

তিস্তা টেলিভিশন ও তিস্তা নিউজ বিডিতে দেশের সকল জেলা উপজেলা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। উদ্যোমী পরিশ্রমী সৎ নির্ভীক ও দেশপ্রেমিক সাংবাদিক, যিনি সৃজনশীল মনন ও মানসে লালিত এবং বাঙালি জাতিসত্তা ও জাতীয় চেতনায় সদাজাগ্রত এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শ ও প্রেরণায় উজ্জীবিত, এমন প্রগতিশীল ভাব ও ভাবনায় দীক্ষিত সংবাদকর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হবে। আগ্রহীদের সর্বনিম্ন এক বছরের অভিজ্ঞতা ও কর্মষ্ঠ হতে হবে। যে কোনো বিষয়ে নূন্যতম স্নাতক অথবা স্নাতক অধ্যয়নরত হতে হবে। ইংরেজি সাংবাদিকতা বা গণযোগাযোগে স্নাতক অথবা অধ্যয়নরত প্রার্থীরা অধিকতর গুরুত্ব পাবেন। আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশ্বব্যাপী প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন দিন। যোগাযোগঃ +8801740983512 (হটলাইন)

 রোহিঙ্গা সংকট ও চীনা কূটনীতি বাংলাদেশ-মিয়ানমার

| 13-12-2019 | 126 পরিদর্শন

তুরিন আফরোজ 

 

রোহিঙ্গা সংকট ও চীনা কূটনীতি দুই বছর ধরেই চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানের উপায় খুঁজতে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার দুই দেশেরই বন্ধু চীন। ফলে চীনের দাবি, রোহিঙ্গাদের মতো একটি স্পর্শকাতর ইস্যুর সমাধান করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুটি দেশই যেন লাভবান হয়। গত ২৪ নভেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে রোহিঙ্গাবিষয়ক এক সেমিনারে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যার ‘টেকসই’ সমাধানে চীন নিজস্ব ‘রোডম্যাপ’ অনুসারে কাজ করছে। তিনি মনে করেন, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের ‘বিশ্বাসের ঘাটতি’ দেখা দিয়েছে। রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারের মাঝে পারস্পরিক বিশ্বাসের ঘাটতি এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মাঝে রোহিঙ্গা উত্তেজনা মোকাবিলায় লি জিমিং তার প্রস্তাবিত ডিপ্লোম্যাটিক সমাধানের নাম দিয়েছেন ‘ওয়ান প্লাস ওয়ান প্লাস টু’ (১+১+২)। চীনের ‘ওয়ান প্লাস ওয়ান প্লাস টু’ (১+১+২) ফর্মুলাটি আসলে কী? ওই সেমিনারে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং এই ফর্মুলা উপস্থাপন করেন। তার বয়ান অনুসারে, বাংলাদেশে আশ্রিত একটি রোহিঙ্গা পরিবার তার পরিবারের একজনকে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করবে, যে কিনা মিয়ানমারে ফিরে যাবে। চীন তাদের দুটি মোবাইল ফোন দেবে। একটি ওই প্রতিনিধির কাছে থাকবে, আরেকটি থাকবে বাংলাদেশে আশ্রিত তার পরিবারের সদস্যদের কাছে। মিয়ানমারে গিয়ে প্রতিনিধি স্বচক্ষে পরিস্থিতি দেখবেন, রাখাইনের পরিস্থিতি ভালো ও নিরাপদ কিনা তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করবেন। সেই আলোকে তারা দেখবে, সামনে এগোনো যাবে কিনা। পরিস্থিতি ভালো থাকলে বাংলাদেশে আশ্রিত পরিবার মিয়ানমারে যাবে। পরিস্থিতি খারাপ থাকলে বাংলাদেশে আশ্রিত পরিবার মিয়ানমারে যাবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কতটা কার্যকর হবে? প্রতিনিধি রাখাইনে গিয়ে দেখল যে পরিস্থিতি ভালো, তাহলে তো কথাই নেই। পরিবারের বাকি সদস্যরা নিশ্চিন্তে সীমানা পেরিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে গেল। কিন্তু প্রতিনিধি যদি রাখাইনে গিয়ে দেখে যে পরিস্থিতি ভালো না, তাহলে সে নিজে কি ফেরত আসতে পারবে বাংলাদেশে? নিদেনপক্ষে ফিরতি ফোনকল করে কি সেটা জানানোর সময় পাবে? এই নিশ্চয়তা কে দেবে? চীনের এই ‘মোবাইল ডিপ্লোম্যাসি’ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে আমার সংশয় রয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে চীনের সদিচ্ছা কতটুকু, তা বলা মুশকিল। জাতিসংঘের মতে, আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে নিপীড়িত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা। বছরের পর বছর ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ রক্ষার নামে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার রাষ্ট্রের যে নির্মম নিপীড়ন চালিয়ে আসছে, তার থেকে চোখ ফিরিয়ে বিশ্বশান্তির কথা বলা, এমনকি চিন্তা করাও নিতান্ত হাস্যকর। রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্মম নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। অথচ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চীন রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টিকে মিয়ানমারের ‘একান্তই অভ্যন্তরীণ’ বিষয় বলে অভিহিত করেছে। গণহত্যা কবে থেকে একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়! রোহিঙ্গা সমস্যার কারণ ও বর্তমান পরিস্থিতি অনুসন্ধানে জাতিসংঘের বিশেষ দূত মিস ইয়াংঘি লি ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের কক্সবাজার পরিদর্শনে আসেন। পরিদর্শন শেষে ইউএনওএইচসিএইচআর বা জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনারের দপ্তর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে মিয়ানমারে যে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটে চলেছে, তার সূক্ষ্ণ ইঙ্গিত রয়েছে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের ওপর সেখানকার সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও তাদের মদদপুষ্ট উন্মত্ত জনতা নির্দি্বধায় ব্যাপকভাবে গণধর্ষণ, শিশু হত্যা, নিষ্ঠুর শারীরিক নির্যাতন, গুম ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। ইয়াংঘি লি যাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের বেশিরভাগই স্বচক্ষে নিজ পরিবারের সদস্যদের নিহত হতে দেখেছে। অনেকের পরিবারের সদস্যরা এখনও উধাও। শিশুদের, এমনকি যাদের বয়স আট বছর, পাঁচ বছর অথবা মাত্র আট মাস, তাদেরও জবাই করে মেরে ফেলা হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, ইয়াংঘি লি তার পরিদর্শনের সময় মোট ১০১ জন নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তাদের অর্ধেকেরও বেশি দাবি করেন, তারা মিয়ানমারে ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও বিভিন্ন প্রকারের যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। হাজার হাজার রোহিঙ্গার বাড়িঘর, স্কুল, হাটবাজার, দোকান, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। তাদের খাদ্যশস্য, ক্ষেত-খামার ও গবাদি পশু লুট করা হয়েছে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের তাদের বাসস্থান ও দেশ থেকে জবরদস্তি বিতাড়ন করা হয়েছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও রোহিঙ্গা সংকটে চীন আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। এই যে নিরপেক্ষতার অভয়বাণী চীন দিয়ে যাচ্ছে, তার পেছনে চীনের সুবিধাজনক স্বার্থ জড়িত রয়েছে। মিয়ানমারে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ যে দেশটির, তা হচ্ছে চীন। পশ্চিমা দেশগুলোর বিনিয়োগ মিলিয়ে এর ধারেকাছেও নেই। তাহলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো পাওয়ারের অধিকারী চীন কখনই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যাবে না, তা মুখে যতই নিরপেক্ষতার কথা সে বলুক না কেন। চীনের বৈদেশিক আমদানি পণ্যের মধ্যে আছে জ্বালানি বা তেল-গ্যাস। এই পণ্যগুলো যায় মালাক্কা প্রণালি দিয়ে। চীন এ ব্যাপারে খুবই সচেতন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যদি তাদের কোনো সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রণালিটি অবরুদ্ধ করে দিতে পারে। এ জন্যই তারা কৌশলগত কারণে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে যাওয়ার একটা পথ ব্যবহার করতে চায়। ইতোমধ্যেই মিয়ানমারের আকিয়াব বন্দর থেকে চীনের ইউনান বা কুনমিং পর্যন্ত পাইপলাইন দিয়ে তেল-গ্যাস সরবরাহ চলছে। একটা রেললাইনও করার কথা আছে। তা ছাড়া তারা মিয়ানমারে অর্থনৈতিক জোন করবে। এরই মাঝে আন্তর্জাতিকভাবে চীন সরকার সমর্থিত গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসে ১০ সেপ্টেম্বরের সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল- ‘রাখাইন সহিংসতার জন্য কি সু চি দায়ী?’ শিরোনাম থেকেই বোঝা যায়, তারা এ জন্য সু চিকে দায়ী করতে চায় না; বরং মিয়ানমারের পরিস্থিতি ও বাস্তবতা না বুঝে সু চির সমালোচনা করার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর কঠিন সমালোচনা করা হয়েছে। এদিকে উইঘুর মুসলিমদের নিয়েও চীন বেশ সমস্যার মধ্যে আছে। ‘মুসলিম’ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিয়ে সম্ভবত সে কারণে তাদের ভয়টা একটু বেশি। সবশেষে মনে রাখতে হবে, চীনের স্বার্থ যদি মিয়ানমারের পক্ষে থাকে, তবে চীন সেদিকেই অবস্থান নেবে। কোনো কূটনীতি বা এর কোনো সাফল্যই তাদের বাংলাদেশের পক্ষে আনতে পারবে না। তাই চীনের এই নব্য ‘মোবাইল ডিপ্লোম্যাসি’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেটওয়ার্কই খুঁজে পাবে কিনা সন্দেহ।

আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট